বুধবার, ১৭ জানুয়ারী ২০১৮, ০৬:০২

মন্তব্য-বিশ্লেষণ
রবিবার, ০৩ মে ২০১৫ ১০:৪৭:০৮ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

গোলাম মাওলা রনি

আগামীতে কুত্তা মার্কায় দাঁড়াইয়েন!

শিরোনামের কাহিনীটি বড়ই অদ্ভুত এবং বাঙালির ভবিষ্যৎ রুচিবোধের জন্য একটি অশনিসংকেত। ঘটনার দিন ছিল ৩০ এপ্রিল। অফিসে বসে কাজ করছিলাম। হঠাৎ মোবাইলে একটি ফোন এলো। অন্য প্রান্ত থেকে মেয়েলি কণ্ঠে জনৈক যুবক বলল, ‘ভাই, আমি লালবাগ থেকে বলছি। জীবনের প্রথম ভোটটি আপনাকে দিলাম; কিন্তু আপনি তো জামানত হারাইলেন।’ যুবকের কথা বলার ধরন দেখে আমি অনুমান করলাম যে, সে আমাকে টিটকারী মেরে আনন্দ লাভ করতে চাচ্ছে। আমি সতর্ক হয়ে তার পরবর্তী বাণীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। সে আবার বলল, ‘আগামীতে আমাদের ওয়ার্ডে কমিশনার পদে দাঁড়াইয়েন, ভোট দেব।’ আমি বললাম, আচ্ছা । যুবক বলল, ‘ভাই, কুত্তা মার্কায় দাঁড়াইয়েন।’ আমি বললাম, আপনার আব্বা এবং আম্মাকে বলেন আগামীতে কুত্তা এবং শুয়োর প্রতীক বরাদ্দের ব্যবস্থা নিতে। যুবক কী বুঝল জানি না, ফোন রেখে দিল। ২৮ এপ্রিল, ২০১৫ সালের নির্বাচন নামক ছোটদের কার্টুন বা পাপেট শো দেখার পর আমি ভাবছিলাম দুষ্ট বুদ্ধিতে কে বড়- শয়তান নাকি মানুষ! যুবকের কথা শুনে আমি কুকুর প্রতীকের সম্ভাব্য ভোটারদের নিয়েও ভাবনা শুরু করলাম। তখন মনে হলো এই প্রহসনের নেপথ্য কাহিনী সম্পর্কে আমার কিছু বলা উচিত। আমি প্রার্থী হওয়ার পর সরকারি দল থেকে কোনো হুমকি-ধমকি, বাধা-বিপত্তি না এলেও বিরোধী দল থেকে অনেক প্রস্তাব পাই। আমি বিনয়ের সঙ্গে সব প্রস্তাব ফিরিয়ে দিই এবং নিজের মতো প্রচারণা চালাতে থাকি।

আমি প্রথমেই টার্গেট করি ৪ লাখ ভোটারকে যারা কোনোমতেই বিএনপি এবং আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে না। আমি ব্যক্তিগত যোগাযোগ; মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডায় গিয়ে ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে প্রায় দেড় লাখ লোকের সঙ্গে মতবিনিময় করি। আমার নির্বাচনী এলাকার প্রায় ৫০ হাজার ভোট এবং রক্তসম্পর্কীয় আÍীয়স্বজনের ৫০ হাজার ভোট টার্গেট করি। পুরান ঢাকার একটি এলাকায় আমার আত্মীয়রা সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে আসছেন, এবারও একজন কমিশনার হয়েছেন ২৬ হাজার ভোট পেয়ে। সেই ভোট এবং তরুণ ও মহিলাদের ভোট টার্গেট করে আমি কৌশলে প্রচার চালাতে থাকি এবং যথাসময়ে ইতিবাচক সাড়া পাই।
আমি টিভি মিডিয়া পরিহার করেছিলাম এই উদ্দেশ্যে, যেন আমার প্রতিপক্ষরা আমার কৌশল টের না পায়। তারা যদি বুঝত যে আমি নির্বাচনের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগী তাহলে পদে পদে ঝামেলা সৃষ্টি করত। আমি আমার পরিকল্পনায় কতটা সফল হয়েছিলাম তা সরকার যেমন টের পেয়েছে তেমনি বিরোধী দলও অনুভব করেছে। দেশের সব রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মতো আমিও বিশ্বাস করতাম যে, সরকার নির্বাচনটি অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু করবে। সরকার যদি তিনটি সিটিতেই হারত তাহলে তাদের উপকার বই অপকার হতো না। কিন্তু সরকারি দল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মারাত্মক অন্তর্দন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থায় যে কোনো মূল্যে প্রার্থীদের বের করে আনা ছাড়া কোনো বিকল্প খুঁজে পেল না। আমি এ ঘটনা টের পাই ২২ এপ্রিল বিকালবেলা, যখন আমার কার্যত কিছুই করার ছিল না।

আমি প্রচারণা বন্ধ করে দিই এবং এজেন্ট নিয়োগ স্থগিত করি। ২৫ তারিখ বাংলাদেশ প্রতিদিন অফিসে সব প্রার্থী নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক ছিল, যা দুটি সরকার সমর্থক টিভি লাইভ প্রচার করে। ২৩ তারিখ সকালে বাংলাদেশ প্রতিদিন অফিস থেকে আমার কাছে আমন্ত্রণ এলে আমি তা ফিরিয়ে দিই এই বলে যে, আমার ওখানে গিয়ে কোনো লাভ হবে না। কারণ ফলাফল নির্ধারণ হয়ে আছে- আমার জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। এরই মধ্যে সাঈদ খোকনের সঙ্গে আমার একদিন দেখা হলো এবং তাকেও আমি আমার জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার কথা বললাম। সে হাসল এবং আবদার করল রনি ভাইয়ের সঙ্গে একটি ছবি তোলার জন্য। প্রাপ্ত ভোটের ফলাফলে আমার ভোট ১ হাজার ৮৮৭ দেখানো হলেও আমি যে কত ভোট পেয়েছি এবং কত ভোট পেতাম, তা একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন।

দক্ষিণ ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় ভোট গ্রহণ চলেছে মাত্র দুই ঘণ্টা। এরই মধ্যে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যায়। ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে হয় ফিরে আসেন নয় তো লাঞ্ছিত হতে থাকেন। এ দুই ঘণ্টার ভোট গ্রহণের পর নির্বাচন কমিশনকে হিসাব মেলানোর জন্য ১ লাখ ২৬ হাজার বৈধ ব্যালট পেপার বাতিল করতে হয়। এর বাইরে সরকারি দলের লোকজন প্রায় আড়াই লাখ ব্যালট ছিঁড়ে ফেলেন। এখন প্রশ্ন হলো, বাতিল হওয়া এবং ছিঁড়ে ফেলা প্রায় পৌনে ৪ লাখ ভোট কে পেয়েছিল? যারা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করেছেন তারা ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই সরকারি প্রার্থী এবং বিএনপি প্রার্থীর ভোট নির্ধারণ করে সিল পিটিয়ে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে রেখেছেন। বাকি ব্যালট নিয়ে নির্বাচন শুরুর এক ঘণ্টার মধ্যেই তারা বুঝতে পারেন যে তৃতীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট পড়ছে, যা তাদের চিন্তা-চেতনা ও গণনার মধ্যে ছিল না। দ্রুত ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যায় এবং নির্বাচনী কেন্দ্রে শুরু হয় উত্তেজনা। ফলে তড়িঘড়ি করে ঘটতে থাকে একটার পর একটা অঘটন। এত কিছুর পরও তারা হিসাবের খাতায় রেখে যায় হিমালয় পর্বতের মতো মারাÍক অনিয়মের প্রমাণ, যার বিচার একসময় ইতিহাস অবশ্যই করবে।

সবাই জানে ঢাকায় আওয়ামী লীগের মোট ভোট মাত্র ৩০%। ঢাকা দক্ষিণে ৩০% হিসাবে তাদের ভোটার মাত্র ৫ লাখ ৬০ হাজারের মতো। নির্বাচন কমিশন দেখিয়েছে ৪৭% ভোট কাস্টিং হয়েছে। এ হিসাবে সাঈদ খোকনের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা হওয়া উচিত ছিল মাত্র ২ লাখ ৬৩ হাজার। অথচ তার পক্ষে সিল পেটানো হয়েছে ৫ লাখ ৩৫ হাজারেরও বেশি। অন্যদিকে ৫ লাখ ৩৫ হাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মির্জা আব্বাসের ভোট হয়েছে প্রায় পৌনে ৪ লাখ। পরে যখন আরও ৪ লাখের মতো ভোট পড়ে যায় মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে তখন সংশ্লিষ্টরা দিশাহারা হয়ে পড়েন। নতুন করে লেখা হয় সংলাপ। তাতে অভিনীত হয় আড়াই লাখ ব্যালট ছেঁড়ার দৃশ্য এবং ১ লাখ ২৬ হাজার ব্যালট বাতিলের গল্প।

সব শেষে মঞ্চায়িত হয় গোলাম মাওলা রনির জামানত হারানোর দৃশ্য।ইচ্ছা ছিল কিছু বলব না। ১ হাজার ৮৮৭ ভোটের ফল নিয়ে নিজেকে আবৃত করে রাখব এবং প্রতিপক্ষকে আনন্দ করতে দেব অবাধে। সেমতে ফেসবুকে বৃহস্পতিবার স্ট্যাটাসও দিলাম, যা কি না দেশের প্রধান দৈনিক হুবহু ছাপিয়েছে এবং অনেক অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। ফেসবুকের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারেও স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি শেয়ার এবং লাইক পেয়েছে। কিছু তরুণ বন্ধুর বিরূপ মন্তব্য এবং অন্য বন্ধুদের হতাশ মনোভাব দেখে আমার মনে হলো জাতিকে সত্য কথা জানানো উচিত যদিও মনেপ্রাণে আমি চাইনি যে আমার দল বিব্রত হোক। তার পরও লিখলাম কেবল প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য যারা শত প্রতিকূলতার মাঝেও দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। তাদের জন্য বলছি, গোলাম মাওলা রনি পরাজিত হয়নি বরং প্রচারণার সময় সব মহলের অকুণ্ঠ ভালোবাসা, সমর্থন এবং সহযোগিতা পেয়েছে; যার তুলনা হয় না। কাজেই ২৮ এপ্রিলের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাকে নির্বাচন না মনে করে দুর্ঘটনা মনে করাই উত্তম। আর সেই দুর্ঘটনায় আমরা যারা আহত হয়েছি, তারা বড়জোর মর্মাহত হতে পারি; কিন্তু লজ্জিত বা অপমানিত বোধ করার কোনো কারণ নেই।লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

 

সর্বশেষ খবর