বুধবার, ১৭ জানুয়ারী ২০১৮, ০৫:৫৯

ইসলাম ও জীবন
শুক্রবার, ১৫ মে ২০১৫ ০৩:০৫:২৭ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

মেরাজের তাৎপর্য ও শিক্ষা

মুফতি মুহাঃ আবদুল লতিফ শেখ

আল্লাহ তায়ালা মানুষের হেদায়েতের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল এ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। নবীদের নবুয়তের দাবির সত্যতার প্রমাণে তাদের তিনি অলৌকিক ক্ষমতা দান করেছেন। শরিয়তের পরিভাষায় যাকে বলে মোজেজা। মোজেজা অর্থ অক্ষমকারী। কেননা ওই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে মাখলুক অক্ষম হয়ে থাকে। আল্লাহ তায়ালার নীতি হলো তিনি প্রত্যেক নবীকে তার যুগে প্রচলিত কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণকারী অলৌকিক ঘটনা দান করে থাকেন। সে হিসেবে মুসা (আ.) এর আমলে মিসরে জাদুবিদ্যার প্রভাব বেশি থাকায় আল্লাহ তায়ালা মুসা (আ.) কে হাতের লাঠি সাপে পরিবর্তন হওয়ার মোজেজা দান করেন, যা ওই যুগের সব জাদুকে পরাজিত করেছিল। অথচ মুসা (আ.) এর কর্মটি জাদু ছিল না বরং তা ছিল খোদায়ি সাহায্য বা মোজেজা। অনুরূপ হজরত ঈসা (আ.) এর সময় চিকিৎসাবিদ্যার উন্নতি শুরু হওয়ায় আল্লাহ তায়ালা তাকে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য করার বিশেষ মোজেজা দান করেন।

সে ধারাবাহিকতায় মহানবী (সা.) যখন প্রেরিত হলেন, তখন আরবে আরবি সাহিত্যের জয়জয়কার ছিল। আল্লাহ তায়ালা মহানবী (সা.) কে সর্বযুগের সব সাহিত্যকর্মকে পরাভূতকারী কালোত্তীর্ণ কিতাব আল কোরআন দান করলেন।

মহানবী (সা.) যেহেতু সর্বশেষ নবী ও রাসুল, তার পরে কেয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবী বা রাসুল আগমন করবেন না। তাই তার কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সব উম্মতের ওপর মহানবী (সা.) এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণকারী একটি মোজেজা যৌক্তিকভাবেই প্রয়োজন ছিল। কারণ আল্লাহ তায়ালা জানেন, তার নবীর উম্মতরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করবে। তারা চাঁদে যাবে। মঙ্গলগ্রহে যান পাঠাবে। তারা গতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। তাদের যুগ হবে গতির যুগ। তাই আল্লাহ তায়ালা তার নবী (সা.) কে এমন একটি বৈজ্ঞানিক মোজেজা দান করলেন যার মাধ্যমে তিনি তার নবীকে কেয়ামত পর্যন্ত আগত সব বিজ্ঞান, সব গতি ও আবিষ্কারকে পরাস্ত করে দিলেন। তাঁর নবীকে করলেন সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ। মহানবী (সা.) এর ইসরা ও মেরাজ ছিল তেমনি একটি বৈজ্ঞানিক মোজেজা। বর্তমান গতির যুগের বিজ্ঞানীরা বা মহাকাশ বিজ্ঞানীরাও যে বিষয়ে চিন্তা করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন। কারণ এটা মূলত সৃষ্টিকর্তার কাজ। তার কোনো মাখলুক এর হিসাব মেলাতে পারবে না। তিনি এর মাধ্যমে স্বীয় বন্ধুকে জগতের সবার ওপর মর্যাদা দিয়েছেন।

মক্কা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমণকে কোরআনের ভাষায় ইসরা আর বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে ঊর্ধ্বাকাশে ভ্রমণকে মেরাজ বলা হয়। পবিত্র কোরআনের সূরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘পবিত্র সেই সত্তার, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের একাংশে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন। যার চারপাশে আমি বরকত দান করেছি, তাকে আমার নিদর্শনগুলো দেখানোর জন্য। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ১)। হাদিস শরিফে এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।

বিশের অধিক সাহাবি এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। (তাফসিরে কুরতুবি : ২০৫/১০)।

ইসরা ও মেরাজের ঘটনা বিশ্বাস করা ইসলামী আকিদার অন্তর্ভুক্ত, ফরজ। আর অস্বীকারকারী ইসলামে কাফের বলে গণ্য হয়। ওলামায়ে কেরাম মেরাজের বিভিন্ন ঘটনার রহস্য বয়ান করেছেন। মেরাজ সংঘটিত হওয়ার আরেকটি রহস্য হলো মহনবী (সা.) কে সান্ত্বনা দেয়া। নবুয়তের দশম বর্ষে যখন মহানবী (সা.) এর বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মতো এক ব্যক্তিত্ব চাচা আবু তালেব এবং কিছু দিন পর ঘরে সান্ত্বনাদায়িনী স্ত্রী খাদিজা (রা.) মারা গেলেন, তখন তিনি তায়েফ এলাকায় গিয়েছিলেন ইসলাম প্রচারের জন্য। কিন্তু সেখান থেকেও পাথরের আঘাত সহ্য করে ফেরত এলেন। তখন তার মানসিক সান্ত্বনা খুবই প্রয়োজন ছিল। তাই আল্লাহ তায়ালা তাকে স্বীয় কুদরতের নিদর্শন দেখানোর জন্য মেরাজ ও ইসরার মোজেজা দান করলেন।

তাই তো আল্লাহ তায়ালা মেরাজের ঘটনা বর্ণনার শুরুতে সুবহানা শব্দ দিয়ে বর্ণনা দিলেন। কারণ আশ্চর্য বিষয় শুনে সুবহান আল্লাহ বলতে হয়।

মেরাজ কেন রাতে সংঘটিত হলো, দিনে কেন হলো না, সে প্রশ্নের রহস্য বর্ণনায় আল্লামা ইবনুল মুনাইয়ির (রহ.) বলেন, কারণ পরিভাষায় রাত হলো গোপন সাক্ষাতের সময়। তাছাড়া তখনকার সময় রাতের বেলা ছিল সালাতের সময়। তাই তা দিনের সময় অপেক্ষা উত্তম। তাছাড়া দিনের মেরাজ হলে তা আর গায়েবের বিষয় থাকত না বরং তা সবাই দেখত এবং তাতে বিশ্বাসের পরীক্ষা হতো না।’ (সিরাতে শামিয়া : ১৪/৩)।

মেরাজের সূচনা হয়েছিল মক্কার মসজিদে হারাম থেকে। আর এর প্রথম গন্তব্য ছিল ফিলিস্তিনের বায়তুল মোকাদ্দাস এবং সেখান থেকে পরবর্তী গন্তব্য ছিল ঊর্ধ্বাকাশ। মক্কা থেকে সরাসরি কেন আকাশে না নিয়ে মহানবী (সা.) কে আগে বায়তুল মোকাদ্দাস নেয়া হলো সে প্রশ্নের রহস্য বর্ণনায় ওলামায়ে কেরাম বলেন, মহানবী (সা.) কে বায়তুল মোকাদ্দাসে নেয়ার কারণ ছিল সব নবীর ওপর তার মর্যাদা প্রদান। কেননা তিনি সেখানে সব নবীর সামনে দাঁড়িয়ে নামাজের ইমামতি করেছিলেন। তাছাড়া সরাসরি আকাশে গেলে মেরাজের সত্যতা প্রমাণের জন্য মক্কাবাসীর কাছে কোনো সুযোগ থাকত না। কোনো কোনো আলেম বলেন, কিছু দিন পরই বায়তুল মোকাদ্দাস মুসলমানদের নামাজের কেবলা হবে, তাই মহানবী (সা.) কে সে কেবলা সরাসরি দেখানোর জন্য আগে বায়তুল মোকাদ্দাস নেয়া হয়। (সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ : ১৮/৩)।

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি মক্কায় আমার ঘরে ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ ঘরের ছাদ ফাঁকা হয়ে গেল এবং জিবরাঈল ফেরেশতা নেমে এসে আমাকে নিয়ে জমজম কূপের কাছে গেল এবং সেখানে আমার বক্ষ বিদীর্ণ করে জমজমের পানি দিয়ে বুক ধুয়ে দিল। আর স্বর্ণের ট্রেতে থাকা ঈমান ও হেকমত দ্বারা আমার বুক পরিপূর্ণ করে দিয়ে তা বন্ধ করে দিল।’ (বোখারি : ৩৪২)। জিবরাঈল (আ.) কেন দরজা দিয়ে প্রবেশ না করে ঘরের ছাদ বিদীর্ণ করে প্রবেশ করলেন? তার জবাবে ওলামায়ে কেরাম বলেন, ‘একটু পরেই যে একটি বিস্ময়কর ও বিরাট অলৌকিক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে তার ভূমিকাস্বরূপ এ ছোট অলৌকিক ঘটনাটি ঘটানো হয়েছিল। তাছাড়া ঘরের ছাদ ফাঁকা হওয়া ও মিশে যাওয়া দ্বারা ইঙ্গিত করা হচ্ছিল যে, একটু পরে আপনার বুক ফাঁড়া হবে এবং জোড়া দেয়া হবে। তথা আপনার বক্ষবিদারণ করা হবে।’ (ফতহুল বারি : ৪৬০/১)। আর শক্কে সদর বা বক্ষ বিদারণের হেকমত বর্ণনায় আলেমরা বলেন, আল্লাহ তায়ালার দিদারের জন্য মহানবী (সা.) কে শারীরিক ও মানসিক উভয়ভাবে প্রস্তুত করাই ছিল এর রহস্য। সূত্র: আলোকিত বাংলাদেশ  

 

সর্বশেষ খবর