সোমবার, ২০ নভেম্বর ২০১৭, ০৩:২৬

অর্থ-বাণিজ্য
শনিবার, ০৪ মার্চ ২০১৭ ০৯:৫৩:০৫ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

রাজনৈতিক ক্ষমতাই রক্ষাকবচ : মামলার আড়ালে শীর্ষ খেলাপিরা

 

 

রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে উজাড় হচ্ছে ব্যাংকের ভাণ্ডার। ক্ষমতাসীন দলের এক শ্রেণীর ডাকসাইটে প্রভাবশালীরা দলীয় পদের প্রভাব খাটিয়ে ঋণের নামে ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিচ্ছেন। অনেকে আবার যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিচ্ছেন সেগুলোকে লোকসানি দেখিয়ে ভিন্ন নামে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন। ঋণ ও দুর্নীতির টাকা নানা উপায়ে বিদেশে পাচার করে নিয়ে যাচ্ছেন। অথচ প্রভাব খাটিয়ে তারা এ সংক্রান্ত মামলার কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ নিয়ে দিব্যি বহাল-তবিয়তে আছেন। এভাবে ক্ষমতা অপব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও লুটপাট বাড়ছে। একই প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের অনুমোদন ও ঋণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া ব্যাংক পরিচালকদের ভাগাভাগি করে নেয়া বিপুল অংকের ঋণ বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। আর নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিতরণ করা এসব ঋণই এখন খেলাপি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে সারা দেশে বর্তমানে অর্থঋণ আদালতে সরকারি-বেসরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংকের প্রায় ৪৫ হাজার মামলা বিচারাধীন। যার বিপরীতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৮ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। এসব ঋণের বেশিরভাগই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সদিচ্ছা এবং কার্যকর শক্ত ব্যবস্থা নেয়া না হলে এসব টাকা কোনো দিন আদায় হবে না। তাছাড়া খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় প্রতি বছর ঋণ সংক্রান্ত মামলাও বাড়ছে। বছরে অর্থঋণ আদালতে যে পরিমাণ মামলা হয়, নিষ্পত্তি হয় তার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। এ কারণে মামলার বিশাল জট তৈরি হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। সূত্র জানায়, বর্তমানে ব্যাংকের খাতায় ৫৪ হাজার কোটি টাকার মন্দ ঋণ আছে। খাতার বাইরে রয়েছে অবলোপনকৃত আরও প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অবলোপনকৃত ঋণ সহসা আর আদায় হবে না ধরে নিয়ে ব্যাংকের বাকি খাতা থেকে তা সরিয়ে ফেলা হয়। এ হিসাবে ব্যাংকিং খাতে উল্লেখিত ৯৬ হাজার কোটি টাকার ভবিষ্যৎ পুরোপরি অন্ধকারে, যা আর কখনও আদায় হবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও নিয়ম রক্ষা করতে গিয়ে এসব মন্দ ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলো বিভিন্ন সময় মামলা করেছে। কিন্তু সেখানেও রাজনৈতিক থাবা আঘাত হেনেছে। সরকারি দলের লেবাসধারী একটি চক্র বিপুল পরিমাণের এ ঋণ গিলে খেয়েছে। তারা প্রভাব বিস্তার করে অর্থ ঋণ আদালদের মামলা কার্যক্রমও আটকে দিচ্ছেন। এরাই হল শীর্ষ খেলাপি। এদের সংখ্যা ১০০ জনের বেশি হবে না। এ তালিকায় ডাকসাইটে আছেন হাতেগোনা কয়েকজন। বিপুল অংকের খেলাপি ঋণ ঢুকেছে তাদের পকেটে। জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বিচারহীনতার কারণে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। এরা বারবার আইনের আশ্রয়ে অর্থাৎ রিট করে স্থগিতাদেশ নিয়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু তাদের শাস্তির আওতায় না আনায় তারা ধরে নিয়েছেন অপরাধ করলে কিছুই হবে না। তিনি বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া খেলাপি ঋণ কমবে না। এছাড়া অর্থঋণ আদালতে খেলাপি ঋণ মামলার বোঝা কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, অ্যাটর্নি জেনারেল ও প্রধান বিচারপতিসহ যৌথ উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এক ব্যাংকার শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, এসব হাই প্রোফাইল ঋণ খেলাপি জনগণের আমানতের টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করলেও গুলশান-বনানীর মতো রাজধানীর অভিজাত এলাকায় থাকেন রাজার হালে। চলেন দামি ব্র্যান্ডের একাধিক গাড়িতে। এমনকি কেউ কেউ সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে উঠাবসা করেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। এটিই চরম বাস্তবতা। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি চলছে। জেনে-শুনে আজেবাজে লোকজনকে ঋণ দেয়া হচ্ছে। পরিচালকদের মধ্যে ঋণ ভাগাভাগির নজির অহরহ তৈরি হচ্ছে। এসব কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে ব্যাংকে ঋণ প্রবৃদ্ধি কাক্সিক্ষত না হলেও প্রতি বছর খেলাপি ঋণের প্রবৃদ্ধি ঠিকই বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অবস্থান পরিষ্কার করা উচিত। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে খেলাপি ঋণ কমাতে চায় কিনা সেটাও ভেবে দেখতে হবে। তবে খেলাপির লাগাম টানতে হলে দ্বৈত শাসনের অবসান করতে হবে। কারণ, সরকারি ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুরোপরি বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে নেই। অথচ মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকই সরকারি ৬ ব্যাংকের। পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল হালিম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, অনেক ব্যাংক শীর্ষ খেলাপিদের সঙ্গে পেরে উঠে না। তারা প্রচুর টাকা খরচ করে শক্তিশালী আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে মামলায় স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন। সে কারণে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায় না। রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আতাউর রহমান প্রধান যুগান্তরকে বলেন, স্বাভাবিক পথে টাকা আদায় না হলে আইনের আশ্রয় নিতে হয়। কেউ তো আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তবে এসব টাকা আদায়ে অনেক সময় লাগছে। তিনি জানান, অর্থঋণ আদালত গঠনের সময় ৬ মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিষয়টি উল্লেখ ছিল। কিন্তু বর্তমানে মামলার যে জট, তাতে দীর্ঘদিনেও মামলা জট খুলছে না। আতাউর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতের আইনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। এসব আইন আরও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজনে সংযোজন-বিয়োজন করা যেতে পারে। সূত্র জানায়, ব্যবসায়ীদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয় অর্থঋণ আদালত। সেই সঙ্গে প্রণয়ন করা হয় অর্থঋণ আদালত আইন-২০০৩। কিন্তু অর্থ আদায়ের বেশিরভাগ মামলা রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় স্বল্পসংখ্যক বিচারকের কারণে আটকা পড়েছে বিচারিক কার্যক্রম। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এ সমস্যা সমাধানে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০১৫ সালে অর্থঋণ আদালতে নতুন মামলা নথিভুক্ত ১ লাখ ৩২ হাজার ৯৩টি এবং নিষ্পত্তি হয় ৯৩ হাজার ৩৯১টি। এর মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ১০ হাজার ২১ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে মামলা এক লাখ ৩০ হাজার ৩৬টি, নিষ্পত্তি হয় ৯২ হাজার ৯২০টি। আদায় হয় ৯ হাজার ৭২৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। ২০১৩ সালে মামলা হয় এক লাখ ২৬ হাজার ৭৯৯টি, নিষ্পত্তি হয় ৯১ হাজার ৬০৮টি। এ সময় আদায় হয় ৯ হাজার ৩৬২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ৩ হাজার ৫৩৯ মামলার বিপরীতে আটকে আছে ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ৭ হাজার ৩৪টি মামলায় ৪ হাজার ৫১৩ কোটি ও রূপালী ব্যাংকের ৩ হাজার ১২টি মামলার বিপরীতে আটকে আছে ১ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ১ হাজার ৩৩৩টি মামলার বিপরীতে আটকে আছে ৪৫৪ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) ২৩৫ মামলায় ১ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ৪ হাজার ২৪৪ মামলার বিপরীতে ১৬৬ কোটি ও বেসিক ব্যাংকের ১৪০ মামলার বিপরীতে আটকে আছে ২ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শামস উল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, মামলার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা খেলাপি ঋণ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে সারা দেশে ৫০ জন আইনজীবী অফিসার নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তারা আইনের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখে টাকা আদায়ের চেষ্টা করবেন। এদিকে জানা গেছে, মামলাসম্পৃক্ত খেলাপি ঋণের মধ্যে বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪২৪টি মামলায় ১ হাজার ৯৭০ কোটি, পূবালী ব্যাংকের ১ হাজার ৪৭৩টি মামলার বিপরীতে আটকে আছে ৪৭৪ কোটি, উত্তরা ব্যাংকের ৭২১টি মামলার বিপরীতে ৯৬৪ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের ৪৪৮টি মামলার বিপরীতে ৮৯২ কোটি, দ্য সিটি ব্যাংকের ৩৩৬টি মামলায় ৬০২ কোটি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ৪০৮টি মামলায় ৭০৭ কোটি, সাউথ ইস্ট ব্যাংকের ১৬০টি মামলায় ৯৫৮ কোটি এবং ঢাকা ব্যাংকের ৭৫টি মামলায় ৪৮৯ কোটি টাকা আটকে আছে।

সর্বশেষ খবর